সুনামগঞ্জ , সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ , ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জুলাইয়ে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩১ জীবিত থাকতে পায়নি, মৃত্যুর পর আইসিইউতে হাম-আক্রান্ত শিশু- অভিযোগ বাবা-মায়ের ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী : জনকল্যাণে অনন্য পথিকৃৎ ভারতীয় মদসহ কথিত সাংবাদিক লিটন আটক ট্রাভেলস ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার বোকা নদীর সেতুতে ঝুলছে ডাম্প ট্রাক, চালক পলাতক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই : প্রধানমন্ত্রী সাড়ে ৬ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ হাজার ৭১২ ভালো কাজের প্রলোভনে ভারতে পাচার, গুয়াহাটি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন সুনামগঞ্জের যুবকের বৈঠার টানেই চলে জীবন-সংসার রবীন্দ্রনাথের জীবন, কর্ম ও দর্শন নিয়ে সাহিত্য আড্ডা দিরাই বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে কিসের হাসিনা, তার চেহারা কি দেখা গেছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ভারত সমর্থন করে না : জয়সওয়াল তাহিরপুরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় দিরাই-শাল্লার উন্নয়ন করতে চাই : এমপি নাছির চৌধুরী গ্রামেগঞ্জে ১৬ ঘণ্টা লোডশেডিং, ক্ষুব্ধ গ্রাহক সব হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিতের নির্দেশ হাইকোর্টের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত সুরমা নদীর পাড় যেন ময়লার ভাগাড়

শিক্ষায় উল্টো স্রোত, ঝরে পড়া রোধে চাই কার্যকর উদ্যোগ

  • আপলোড সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০৯:২৪:৪১ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০৯:২৪:৪১ পূর্বাহ্ন
শিক্ষায় উল্টো স্রোত, ঝরে পড়া রোধে চাই কার্যকর উদ্যোগ
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আবারও বাড়ছে - এটি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার কমার যে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান যেন তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরে ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশে পৌঁছানো শুধু পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবস¤পদ ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিতদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, মাদ্রাসা শিক্ষায় প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষায় অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা-প্রবাহ থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো- কেন শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে? এর উত্তরও কমবেশি আমাদের জানা। দারিদ্র্য, পারিবারিক আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিক্ষা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান ও পরিবেশের অবনতি - সবকিছু মিলেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বিদ্যালয় থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে হাওর, চর ও দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হওয়া, পরিবারের আয় কমে যাওয়া কিংবা বসতভিটা হারিয়ে স্থানান্তরিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির চাপও শিক্ষায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকার বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি ও নানা সহায়তা দিলেও একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যয় কেবল বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পোশাক, জুতা, যাতায়াত, পরীক্ষা, কোচিং, খাতা-কলমসহ নানা খরচ দরিদ্র পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফলে পরিবারের কাছে সন্তানের পড়াশোনার চেয়ে আয়মূলক কাজে যুক্ত হওয়া কিংবা পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করা বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। মেয়েদের ঝরে পড়ার পেছনে বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার সংকটও বড় কারণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝরে পড়ার পরিসংখ্যানেও মেয়েদের অংশ বেশি। ফলে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ালেই হবে না; শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-প্রবাহে ধরে রাখার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা। দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে পড়াশোনার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পরীক্ষার ফল বা পাসের হার নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না; শিক্ষার্থীরা কেন বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার কারণ চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। সরকার ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, পোশাক, জুতা-মোজা বিতরণসহ নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শুধু বিদ্যমান কর্মসূচি অব্যাহত রাখাই যথেষ্ট নয়। ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের জন্য আলাদা সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থী শনাক্তকরণ ও পুনঃভর্তি’ ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে। শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে স¤পৃক্ত করে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যয় কমানো, দুর্গম ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিশেষ পরিবহন ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বর্ষাকালীন বিশেষ শিক্ষা-সহায়তা, নিরাপদ নৌযান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কারিগরি শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষাকে আরও বাস্তবভিত্তিক, সহজলভ্য ও কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনা শেষ করে দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পায়, সে জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঝরে পড়াকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে স¤পর্কিত। তাই প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা থেমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের সম্ভাবনা, একটি সমাজের অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মানবস¤পদের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ যে শিশু বা কিশোর শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে, আগামী দিনে তার একটি অংশ শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য কিংবা অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে ঝরে পড়া রোধে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়, তারা কতটা মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা-ব্যবস্থার শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে - সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। তাই এখনই শিক্ষায় এই ‘উল্টো¯্রােত’ থামাতে হবে। পরিসংখ্যান প্রকাশের পর উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; ঝরে পড়ার প্রতিটি কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত, অঞ্চলভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের শিক্ষা-প্রবাহে ধরে রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স